ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

টিউবারকুলাম সেল্লা মেনিনজিওমা (Tuberculum Sellae Meningioma)

Tuberculum Sellae Meningioma হচ্ছে মস্তিষ্কের টিউমারের একটি বিশেষ ধরন, যা পিটিউইটারি গ্রন্থির ঠিক ওপরে এবং অপটিক নার্ভের (optic nerves) কাছাকাছি অবস্থিত টিউবারকুলাম সেলাই (tuberculum sellae) নামক অংশে জন্মায়। এটি একটি বিনাইন টিউমার (benign tumor), অর্থাৎ ক্যান্সার নয়। তবে, এর অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এটি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই টিউমার বড় হতে থাকলে এটি অপটিক নার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়, এমনকি সম্পূর্ণ অন্ধত্বও হতে পারে। এই কারণে, সঠিক সময়ে সার্জারি করে টিউমার অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি।



ট্রান্সক্রেনিয়াল অ্যাপ্রোচ সার্জারির প্রধান উদ্দেশ্য:
* টিউমার অপসারণ: প্রধান উদ্দেশ্য হল টিউমারটিকে সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা।
* দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার: টিউমারের চাপ থেকে অপটিক নার্ভকে মুক্ত করা, যাতে রোগীর দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার হয় বা আরও ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
* রোগের পুনরাবৃত্তি রোধ: সম্পূর্ণ অপসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে টিউমার আবার ফিরে আসার ঝুঁকি কমানো।



সার্জারির পদ্ধতি:
Tuberculum Sellae Meningioma-র সার্জারির জন্য প্রধানত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
১. (Transsphenoidal Approach): এটি একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
* পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে নাক বা উপরের ঠোঁটের ভেতর দিয়ে একটি সরু রাস্তা তৈরি করে টিউমারে পৌঁছানো হয়। সার্জন একটি এন্ডোস্কোপ (endoscope) ব্যবহার করে দেখতে পান এবং বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে টিউমার অপসারণ করেন।
* সুবিধা:
* মাথার খুলি খোলার প্রয়োজন হয় না, তাই এটি একটি কম আক্রমণাত্মক (minimally invasive) পদ্ধতি।
* মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো এড়িয়ে সরাসরি টিউমারে পৌঁছানো যায়।
* অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায় এবং হাসপাতালে থাকার সময় কম লাগে।
* অসুবিধা:
* বড় বা জটিল টিউমার অপসারণের জন্য এই পদ্ধতি সব সময় কার্যকর নয়।
* কিছু ক্ষেত্রে, টিউমারের অংশবিশেষ রয়ে যেতে পারে, যা পরে আবার বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
২. ক্রেনিয়োটমি (Craniotomy): এই পদ্ধতিতে মাথার খুলি খুলে টিউমার অপসারণ করা হয়। এটি সাধারণত বড় বা জটিল টিউমারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
এ পদ্ধতিতে মাথার স্কাল্প (scalp) কেটে, মাথার খুলি থেকে হাড়ের একটি অংশ সরিয়ে মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে টিউমারের কাছে পৌঁছানো হয়।
* ধরন: এই ক্রেনিয়োটমির বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যেমন সুপরাঅরবিটাল (supraorbital) বা ফ্রন্টোটেম্পোরাল (frontotemporal) অ্যাপ্রোচ। এটি নির্ভর করে টিউমারের অবস্থান এবং আকারের উপর।
* সুবিধা:
* সার্জন টিউমার এবং পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যেমন অপটিক নার্ভ ও রক্তনালীগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পান।
* এর ফলে টিউমারটি সম্পূর্ণ অপসারণের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
* এটি বড় এবং জটিল টিউমারের জন্য উপযুক্ত।
* অসুবিধা:
* এটি একটি বড় ও আক্রমণাত্মক সার্জারি।
* সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে এবং হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হয়।
* সংক্রমণের ঝুঁকি, মস্তিষ্কে ফোলা বা রক্তপাতের ঝুঁকি বেশি থাকে।



সার্জারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও ঝুঁকি:
* পুনরুদ্ধার: সার্জারির পর রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। যদি সফলভাবে টিউমার অপসারণ করা হয় এবং অপটিক নার্ভের উপর চাপ কমে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তির উন্নতি হতে পারে।
* ঝুঁকি: যদিও এই সার্জারি সাধারণত নিরাপদ, তবে কিছু ঝুঁকি থাকে। যেমন:
* দৃষ্টিশক্তির আরও ক্ষতি: সার্জারির সময় অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেতে পারে।
* হরমোন সংক্রান্ত সমস্যা: পিটিউইটারি গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হলে হরমোনজনিত সমস্যা হতে পারে।
* সেরিব্রাল স্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) লিক: মস্তিষ্কের চারপাশে থাকা তরল বের হয়ে আসার ঝুঁকি থাকে।
* সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, বা স্ট্রোক।

চিকিৎসক রোগীর বয়স, টিউমারের আকার, অবস্থান এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে সঠিক সার্জারি পদ্ধতি নির্বাচন করেন। সাধারণত, এন্ডোস্কোপিক ট্রান্সনাসাল পদ্ধতি (Transsphenoidal) ছোট টিউমারের জন্য এবং ক্রেনিয়োটমি বড় ও জটিল টিউমারের জন্য বেশি উপযোগী। সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সার্জারি করা হলে এই ধরনের টিউমারের চিকিৎসা অত্যন্ত সফল হতে পারে।

Leave a Comment

Scroll to Top