ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

লুম্বার স্পাইনাল ক্যানাল স্টেনোসিস(Spinal Canal Stenosis)

লুম্বার স্পাইনাল ক্যানাল স্টেনোসিস(Spinal Canal Stenosis) হল মেরুদণ্ডের একটি অবস্থা যেখানে মেরুদণ্ডের ক্যানাল বা স্পাইনাল কর্ডের মধ্য দিয়ে যাওয়া পথটি সরু বা সংকুচিত হয়ে যায়। এই ক্যানালটি মেরুদণ্ডের হাড় এবং অন্যান্য টিস্যু দিয়ে গঠিত। যখন এটি সরু হয়ে যায়, তখন স্পাইনাল কর্ড এবং স্নায়ুর (Nerve Roots) উপর চাপ পড়ে, যা ব্যথা, অসাড়তা, এবং দুর্বলতার কারণ হতে পারে। এই অবস্থাটি সাধারণত বয়সের সাথে সম্পর্কিত এবং ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের লোকেদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

লুম্বার স্পাইনাল ক্যানাল স্টেনোসিসের কারণ:
* অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis): এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। মেরুদণ্ডের হাড়ের জয়েন্টগুলোতে (Facet Joints) ক্ষয় এবং হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি (Bone Spurs) ঘটে, যা ক্যানালকে সরু করে দেয়।
* ডিস্কের সমস্যা (Herniated or Bulging Disks): বয়সের সাথে ডিস্কগুলো শুকিয়ে যায় এবং তাদের উচ্চতা কমে যায়। এর ফলে ডিস্কগুলো বাইরে বেরিয়ে আসে বা ফুলে যায়, যা স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে।
* লিগামেন্টের মোটা হয়ে যাওয়া (Thickened Ligaments): মেরুদণ্ডকে একত্রে ধরে রাখা লিগামেন্টগুলো সময়ের সাথে মোটা এবং শক্ত হয়ে যেতে পারে, যা স্পাইনাল ক্যানালের ভিতরের জায়গা কমিয়ে দেয়।
* স্পন্ডাইলোলিসথেসিস (Spondylolisthesis): একটি মেরুদণ্ড অন্যটির উপর পিছলে গেলে এই অবস্থা তৈরি হয়, যা স্পাইনাল ক্যানালকে সংকীর্ণ করে দেয়।
*Flaval hypertrophy :ligamentum flavam মোটা এবং শক্ত হয়ে যেতে পারে, যা স্পাইনাল ক্যানালের ভিতরের জায়গা কমিয়ে দেয়।

লক্ষণ:
* ব্যথা: পিঠের নিচের দিকে, নিতম্বে এবং পায়ে তীব্র ব্যথা। হাঁটা বা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বাড়ে এবং সামনে ঝুঁকে বসলে বা শুয়ে থাকলে কমে। এই অবস্থাকে নিউরোএকজেনিক ক্লডিকেশন (Neurogenic Claudication) বলা হয়।
* অসাড়তা বা ঝিনঝিন অনুভূতি: নিতম্ব, পা বা পায়ের পাতায় অসাড়তা, ঝিনঝিন করা।
* দুর্বলতা: পায়ের পেশী দুর্বল হয়ে যাওয়া, যা হাঁটাচলায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
* গুরুতর ক্ষেত্রে: বিরল ক্ষেত্রে, মূত্র বা মলত্যাগের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং উভয় পায়ে গুরুতর দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে কডা ইকুইনা সিনড্রোম (Cauda Equina Syndrome) বলা হয়, যা একটি জরুরি অবস্থা এবং এর জন্য অবিলম্বে সার্জারি প্রয়োজন।

চিকিৎসা:
প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত অপারেশন ছাড়া চিকিৎসা (Conservative Treatment) দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
* ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs)
* ফিজিওথেরাপি
* শারীরিক কার্যকলাপের পরিবর্তন (যেমন: সামনে ঝুঁকে হাঁটা)
কখন সার্জারি প্রয়োজন হয়?
যদি দীর্ঘমেয়াদি কনজারভেটিভ চিকিৎসা সত্ত্বেও লক্ষণগুলি উন্নতি না হয় এবং রোগীর জীবনযাত্রায় গুরুতর প্রভাব ফেলে, তখন সার্জারি বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, কডা ইকুইনা সিনড্রোম বা ক্রমবর্ধমান স্নায়ু দুর্বলতার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সার্জারি প্রয়োজন।

সার্জারির প্রকারভেদ:
লুম্বার স্পাইনাল স্টেনোসিসের জন্য বিভিন্ন ধরনের সার্জারি রয়েছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল স্নায়ুর উপর থেকে চাপ কমানো এবং স্পাইনাল ক্যানালকে প্রশস্ত করা।
1. ডিকমপ্রেশন সার্জারি (Decompression Surgery):
* ইউনিলেটারাল বাই পোর্টাল ইন্ডোস্কোপিক স্পাইন সার্জারি(Unilateral biportal endoscopic spine surgery) : সর্বাধুনিক এবং অধিক ফলপ্রসূ সার্জারি হিসেবে এটি অধিক প্রচলিত।
* ল্যামিনেক্টমি (Laminectomy): এটি সবচেয়ে প্রচলিত সার্জারি। মেরুদণ্ডের পেছনের হাড়ের অংশ, যা ‘ল্যামিনা’ নামে পরিচিত, তা সরিয়ে ফেলা হয়। এর ফলে স্নায়ুর চারপাশে জায়গা বাড়ে এবং চাপ কমে।
* ল্যামিনোটমি (Laminotomy): ল্যামিনার পুরোটা না সরিয়ে শুধু একটি ছোট অংশ সরানো হয়, যা নির্দিষ্ট স্নায়ুর উপর থেকে চাপ কমায়।
* ফোরামিনোটমি (Foraminotomy): মেরুদণ্ডের যে ছোট ছিদ্র দিয়ে স্নায়ু বাইরে বেরিয়ে আসে (Foramen), সেটি প্রশস্ত করা হয়।
2. মিনিম্যালি ইনভেসিভ স্পাইন সার্জারি (Minimally Invasive Spine Surgery – MISS):
এই ধরনের সার্জারিতে ছোট ছোট ছিদ্র করে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর ফলে পেশী এবং টিস্যুর ক্ষতি কম হয়, রক্তপাত কম হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হতে পারে।
3. স্পাইনাল ফিউশন (Spinal Fusion):
যদি মেরুদণ্ড থাকে (যেমন: স্পন্ডাইলোলিসথেসিস এর ক্ষেত্রে), তবে শুধুমাত্র চাপ কমালেই হয় না। এক্ষেত্রে, মেরুদণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে স্থিতিশীল করার জন্য স্পাইনাল ফিউশন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় দুটি বা তার বেশি মেরুদণ্ডের হাড়কে একসাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ফিউশন সার্জারি প্রায়ই ডিকমপ্রেশন সার্জারির সাথে করা হয়।

সার্জারির ঝুঁকি ও জটিলতা:
যে কোনো বড় সার্জারির মতোই স্পাইনাল সার্জারিতেও কিছু ঝুঁকি থাকে, যেমন:
* সংক্রমণ
* রক্তক্ষরণ
* স্নায়ুর ক্ষতি (Nerve damage)
* অ্যানেস্থেশিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
* ব্যথার সম্পূর্ণ উপশম না হওয়া
* ভবিষ্যতে নতুন লক্ষণ দেখা দেওয়া

সার্জারির ফলাফল:
গবেষণায় দেখা গেছে যে, লুম্বার স্পাইনাল স্টেনোসিসের ক্ষেত্রে সার্জারি প্রায়শই লক্ষণগুলির উপশম করতে এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বেশ কার্যকর। প্রায় ৯০% পর্যন্ত রোগী সার্জারির পরে ভালো ফল পান। তবে, সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার জন্য সঠিক পুনর্বাসন (Rehabilitation) এবং ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment

Scroll to Top