ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

মৃগী( Seizure) রোগীদের কিছু বিশেষ ঝুঁকি

মৃগী( Seizure) রোগীদের কিছু বিশেষ ঝুঁকি থাকে এবং নিরাপদ থাকার জন্য কিছু যত্ন ও করণীয় বিষয় আলোচনা করা হলো:



মৃগী রোগীদের ঝুঁকি:
* আঘাত ও দুর্ঘটনা: খিঁচুনির সময় পড়ে যাওয়া, ধাক্কা লাগা, বা অন্যান্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এটি বিশেষ করে সিঁড়ি, ধারালো বস্তু বা আগুনের কাছে ঘটলে বিপজ্জনক হতে পারে।
* পানিতে ডুবে যাওয়া: খিঁচুনি অবস্থায় পানিতে পড়লে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পুকুর, নদী বা বাথটাবে একা থাকা বিপজ্জনক।
* গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনা: খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে গাড়ি চালানো বিপজ্জনক। খিঁচুনির কারণে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
* শ্বাসকষ্ট: খিঁচুনির সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার বা শ্বাস নিতে কষ্টের ঝুঁকি থাকে।
* অ্যাসপিরেশন (Aspiration): খিঁচুনির সময় বমি হলে তা শ্বাসনালীতে ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
* স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস (Status Epilepticus): এটি একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে খিঁচুনি পাঁচ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় বা রোগী দুটি খিঁচুনির মধ্যে জ্ঞান ফিরে পায় না। এটি মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
* সাডেন আনএক্সপ্লেইন্ড ডেথ ইন এপিলেপসি (SUDEP): এটি মৃগী রোগীদের একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক ঝুঁকি, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ একজন মৃগী রোগীর হঠাৎ unexplained মৃত্যু ঘটে। এর সঠিক কারণ এখনো অজানা।
* মানসিক ও সামাজিক সমস্যা: ঘন ঘন খিঁচুনি বা খিঁচুনির ভয়ে উদ্বেগ, হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে।
* ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: মৃগী রোগের ঔষধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যা রোগীর জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
* গর্ভাবস্থায় জটিলতা: মৃগী রোগে আক্রান্ত মহিলাদের গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি এবং ঔষধের কারণে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।



নিরাপদ থাকতে যত্ন ও করনীয়:
* নিয়মিত ঔষধ সেবন: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত এবং সঠিক
মাত্রায় ঔষধ সেবন করা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ঔষধ বাদ দেওয়া বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়।

* পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুমের অভাব খিঁচুনি ট্রিগার করতে পারে। তাই প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি।
* মানসিক চাপ কমানো: মানসিক চাপ খিঁচুনির একটি বড় কারণ। ধর্ম চর্চার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো উচিত।
* খিঁচুনি ট্রিগারগুলো এড়িয়ে চলা: কিছু নির্দিষ্ট জিনিস (যেমন – উজ্জ্বল আলো, ঘুমের অভাব, অ্যালকোহল, নির্দিষ্ট খাবার) কারো কারো ক্ষেত্রে খিঁচুনি ট্রিগার করতে পারে। এগুলো চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলতে হবে।
* সুষম খাবার গ্রহণ: স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাবার গ্রহণ করা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি এবং খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
* নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ: নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং খিঁচুনির ধরণ ও ঔষধের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ঔষধের ডোজ বা পরিবর্তন সম্পর্কে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
* পরিবার ও বন্ধুদের অবগত রাখা: পরিবারের সদস্য ও কাছের বন্ধুদের রোগীর মৃগীরোগের বিষয়ে জানানো উচিত এবং খিঁচুনি হলে কীভাবে সাহায্য করতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়া উচিত।
* নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা: বাড়িতে ধারালো জিনিসপত্র সাবধানে রাখা, বাথরুমে অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার করা এবং সম্ভব হলে একা না থাকার ব্যবস্থা করা উচিত।
* গাড়ি চালানো: খিঁচুনি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত গাড়ি চালানো উচিত নয়। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এবং আইন মেনে গাড়ি চালাতে হবে।
* প্রথম চিকিৎসার প্রস্তুতি: সবসময় সাথে রোগীর রোগের তথ্য ও ডাক্তারের ফোন নম্বর রাখা উচিত। খিঁচুনি শুরু হলে রোগীকে কীভাবে নিরাপদে রাখতে হবে তার একটি পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
* গর্ভবতী মহিলাদের বিশেষ যত্ন: মৃগী রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলাদের ডাক্তারের পরামর্শে থাকতে হবে এবং ঔষধের সঠিক ডোজ বজায় রাখতে হবে।



মৃগী রোগ একটি দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা, তবে সঠিক যত্ন ও নিয়ম মেনে চললে রোগীরা একটি স্বাভাবিক এবং নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে। কোনো ঝুঁকি বা জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Leave a Comment

Scroll to Top