প্যাগেট'স ডিজিজ (Paget's Disease of Bone)
প্যাগেট’স ডিজিজ (Paget’s disease of bone) হাড়ের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেখানে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সাধারণত, পুরনো হাড় ক্ষয় হয় এবং নতুন হাড় তৈরি হয়, যা একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রক্রিয়া। কিন্তু প্যাগেট’স ডিজিজে, পুরনো হাড় খুব দ্রুত হারে ক্ষয় হতে থাকে এবং শরীর সেই ক্ষতিপূরণ করার জন্য দ্রুত কিন্তু দুর্বল ও অস্বাভাবিক নতুন হাড় তৈরি করে। এই নতুন হাড়গুলো স্বাভাবিক হাড়ের চেয়ে বড়, নরম এবং ভঙ্গুর হয়, যা সহজে ভেঙে যেতে পারে বা বিকৃত হতে পারে।
খুলিতে প্যাগেট’স ডিজিজ (Paget’s Disease of Skull)
প্যাগেট’স ডিজিজ শরীরের যেকোনো হাড়কে প্রভাবিত করতে পারে, তবে প্রায়শই এটি পেলভিস (শ্রোণী), মেরুদণ্ড, পা এবং মাথার খুলিকে প্রভাবিত করে। যখন এটি মাথার খুলিকে প্রভাবিত করে, তখন কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা দেখা যায়।

কারণ (Causes)
প্যাগেট’স ডিজিজের সঠিক কারণ এখনও অজানা। তবে কিছু বিষয় এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে:
* বংশগত কারণ (Genetic Factors): যদি পরিবারের কারও এই রোগ থাকে, তাহলে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। কিছু নির্দিষ্ট জিনের ত্রুটি এই রোগের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়।
* ভাইরাল সংক্রমণ (Viral Infections): কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে শৈশবের কিছু ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন রুবেলা ভাইরাস) ভবিষ্যতে প্যাগেট’স ডিজিজ হওয়ার কারণ হতে পারে, তবে এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
* পরিবেশগত কারণ (Environmental Factors): কিছু পরিবেশগত কারণও এই রোগের উৎপত্তিতে ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
* বয়স (Age): সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়।
লক্ষণ (Symptoms)
মাথার খুলিতে প্যাগেট’স ডিজিজের প্রধান লক্ষণগুলো হল:
* মাথাব্যথা (Headache): এটি একটি সাধারণ লক্ষণ এবং এটি ক্রমান্বয়ে বাড়তে পারে।
* শ্রবণশক্তি হ্রাস (Hearing Loss): মাথার খুলির হাড় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে কানের ভেতরের স্নায়ু বা হাড়ের গঠনকে চাপ দিতে পারে, যার ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে। এটি এক বা উভয় কানে হতে পারে। এছাড়া
multiple cdanial nerve palsy হতে পারে বিশেষ করে চোখের দেখার সমস্যা হতে পারে।
* মাথার খুলির আকার বৃদ্ধি (Enlargement of Skull): মাথার খুলির হাড় বড় বা বিকৃত হতে পারে, যার ফলে মাথা বড় মনে হতে পারে। কখনো কখনো টুপি বা হেলমেট পরতে অসুবিধা হতে পারে।
* ভার্টিগো (Vertigo) বা মাথা ঘোরা: স্নায়ুর উপর চাপের কারণে ভার্টিগো হতে পারে।
* ত্বকের শিরা স্ফীত হওয়া (Dilated Scalp Veins): মাথার খুলির উপরে শিরাগুলি ফুলে যেতে পারে।
* মুখের বিকৃতি (Facial Deformity): বিরল ক্ষেত্রে মুখের হাড় প্রভাবিত হলে মুখের আকৃতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
অনেক সময়, এই রোগের কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না এবং অন্য কোনো কারণে এক্স-রে বা রক্ত পরীক্ষা করার সময় এটি ধরা পড়ে।
রোগ নির্ণয় (Diagnosis)
মাথার খুলিতে প্যাগেট’স ডিজিজ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করা হয়:
* এক্স-রে (X-rays), MRI এবং CT Scan: আক্রান্ত হাড়ের অস্বাভাবিক গঠন, যেমন ঘন হওয়া বা বিকৃতি ধরা পড়ে।
* বোন স্ক্যান (Bone Scan): এটি শরীরের কোন কোন হাড় আক্রান্ত হয়েছে এবং রোগের তীব্রতা কতটা, তা নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
* রক্ত পরীক্ষা (Blood Tests): রক্তে অ্যালকালাইন ফসফেটেজ (Alkaline Phosphatase) এনজাইমের মাত্রা সাধারণত বেশি থাকে, যা হাড়ের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ নির্দেশ করে।
চিকিৎসা (Treatment)
প্যাগেট’স ডিজিজের কোনো নিরাময় নেই, তবে এর লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ এবং জটিলতা প্রতিরোধ করার জন্য চিকিৎসা উপলব্ধ আছে।
* বিসফসফোনেটস (Bisphosphonates): এই ওষুধগুলো হাড়ের অস্বাভাবিক ভাঙ্গন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং নতুন হাড়ের গঠনকে উন্নত করে। এটি সাধারণত সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং মুখে বা ইন্ট্রাভেনাস ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া যেতে পারে।
* ব্যথা উপশমকারী (Pain Relievers): ব্যথার জন্য নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) যেমন আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
* সহায়ক যন্ত্র (Assistive Devices): যদি হাড়ের বিকৃতির কারণে চলাচলে সমস্যা হয়, তাহলে ছড়ি বা ক্রাচের মতো সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
* সার্জারি (Surgery): গুরুতর ক্ষেত্রে, যেমন ফ্র্যাকচার (হাড় ভাঙা), স্নায়ুর সংকোচন (যেমন শ্রবণশক্তি হ্রাস), দৃষ্টি হ্রাস বা হাড়ের গুরুতর বিকৃতি হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
মাথার খুলিতে প্যাগেট’স ডিজিজ একটি গুরুতর অবস্থা হতে পারে, তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত Neurosurgeon এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।