ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

এমসিএ (Middle Cerebral Artery - MCA)

এমসিএ (MCA) অ্যানিউরিজম মস্তিষ্কের রক্তনালীর একটি গুরুতর অবস্থা যেখানে মস্তিষ্কের মিডল সেরিব্রাল আর্টারি (Middle Cerebral Artery) নামক আর্টারির দেয়ালে একটি দুর্বল বা স্ফীত অংশ তৈরি হয়। এটি বেলুনের মতো ফুলে ওঠে এবং যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে, যার ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

কারণ:
MCA অ্যানিউরিজম হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ সবসময় জানা যায় না, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
* উচ্চ রক্তচাপ: এটি আর্টারির দেয়ালের উপর চাপ বাড়িয়ে অ্যানিউরিজম সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়।
* ধূমপান: ধূমপান আর্টারির দেয়ালকে দুর্বল করে।
* বংশগত কারণ: পরিবারে অ্যানিউরিজমের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু জেনেটিক ডিসঅর্ডার, যেমন মারফান সিনড্রোম বা এহলারস-ড্যানলোস সিনড্রোম, অ্যানিউরিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
* অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস: আর্টারির চর্বি জমার কারণে আর্টারির দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
* মাথায় আঘাত: গুরুতর মাথায় আঘাত অ্যানিউরিজম সৃষ্টি করতে পারে।

* সংক্রমণ: কিছু ক্ষেত্রে, আর্টারির মধ্যে সংক্রমণের কারণেও অ্যানিউরিজম হতে পারে।

লক্ষণ:
অনেক সময়, একটি ছোট অ্যানিউরিজম ফেটে না যাওয়া পর্যন্ত কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে, বড় অ্যানিউরিজম মস্তিষ্কের টিস্যু বা স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
* অস্পষ্ট বা( Doublevision )vision ডাবল দৃষ্টি: চোখের পিছনে বা চারপাশে ব্যথা।
* মাথাব্যথা।
যদি অ্যানিউরিজম ফেটে যায়, তাহলে তা একটি গুরুতর মেডিকেল ইমার্জেন্সি এবং তাৎক্ষণিক তীব্র লক্ষণ দেখা যায়:
* হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা: এটি “জীবনের সবচেয়ে খারাপ মাথাব্যথা” হিসাবে বর্ণনা করা হয়।
* বমি বমি ভাব এবং বমি।
* ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
* আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা।
* খিঁচুনি।
* চেতনা হারানো বা বিভ্রান্তি।

* শরীরের একপাশে দুর্বলতা বা অবশতা।

জটিলতা:
অ্যানিউরিজম ফেটে গেলে নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা দিতে পারে:
* সাবঅ্যারাকনয়েড রক্তক্ষরণ (Subarachnoid Hemorrhage – SAH): মস্তিষ্কের পৃষ্ঠের রক্তনালী ফেটে মস্তিষ্ক এবং মাথার খুলির মধ্যবর্তী স্থানে রক্তপাত হয়, যা এক ধরনের স্ট্রোক।
* ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ (Intracerebral Hemorrhage): মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতরে রক্তপাত।
* পুনরায় রক্তপাত: ফেটে যাওয়া অ্যানিউরিজম আবার রক্তপাত ঘটাতে পারে।
* ভাসোস্পাজম (Vasospasm): রক্তনালী সংকীর্ণ হয়ে রক্ত ​​প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে।
* হাইড্রোসেফালাস (Hydrocephalus): মস্তিষ্কের চারপাশে তরল জমা হয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
* খিঁচুনি।

* স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি বা মৃত্যু।

 

চিকিৎসা:

MCA(এমসিএ) অ্যানিউরিজমের চিকিৎসার ধরন অ্যানিউরিজমের আকার, অবস্থান, ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি এবং রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে। প্রধান দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি হল:
* সার্জিক্যাল ক্লিপিং (Surgical Clipping):
* এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের খুলির একটি ছোট অংশ সরিয়ে অ্যানিউরিজমের কাছে পৌঁছানো হয়।
* অ্যানিউরিজমের গোড়ায় একটি ছোট ধাতব ক্লিপ(Yasargil Aneurysm clip) স্থাপন করা হয় যাতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অ্যানিউরিজম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
* এন্ডোভাসকুলার কয়েলিং (Endovascular Coiling):
* এই পদ্ধতিতে একটি ছোট ক্যাথেটার কুঁচকির আর্টারির মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় এবং রক্তনালীর মধ্য দিয়ে অ্যানিউরিজম পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়।

* ক্যাথেটারের মাধ্যমে অ্যানিউরিজমের মধ্যে ছোট ছোট কয়েল প্রবেশ করানো হয়, যা রক্ত জমাট বাঁধিয়ে অ্যানিউরিজমের রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়।

কিছু ক্ষেত্রে, অ্যানিউরিজম ফেটে না গেলে এবং ছোট হলে, ডাক্তাররা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে, যদি ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
অ্যানিউরিজম একটি গুরুতর অবস্থা, এবং সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য একজন নিউরোসার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Leave a Comment

Scroll to Top