ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

কোমর ব্যথা (Low Back Pain)

কোমর ব্যথা (low back pain) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে, কোমর ব্যথা ব্যবস্থাপনায় ব্যায়ামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়শই এটি সারির চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হয়। অস্ত্রোপচারের (সার্জারি) তুলনায় ব্যায়ামের অনেক সুবিধা রয়েছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়।

ব্যায়ামের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কোমর ব্যথার বেশিরভাগ কারণই মেরুদণ্ডের চারপাশের পেশী, লিগামেন্টস, এবং জয়েন্টগুলোর দুর্বলতা, ক্ষয় ও ভারসাম্যের অভাবের সাথে সম্পর্কিত। ব্যায়াম এই সমস্যাগুলোকে নিম্নলিখিত উপায়ে সমাধান করতে সাহায্য করে:
১. পেশী শক্তিশালীকরণ: কোমরের চারপাশের পেশী, বিশেষ করে কোর মাসল (পেটের এবং পিঠের গভীর পেশী) শক্তিশালী হলে মেরুদণ্ডের উপর চাপ কমে। শক্তিশালী পেশী মেরুদণ্ডকে স্থিতিশীল রাখে এবং সঠিক ভঙ্গিমা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
২. নমনীয়তা বৃদ্ধি: নিয়মিত স্ট্রেচিং এবং ফ্লেক্সিবিলিটি ব্যায়াম পেশী এবং লিগামেন্টগুলোকে নমনীয় রাখে, যা কোমরের আড়ষ্টতা কমায় এবং চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য আনে।
৩. রক্ত চলাচল বৃদ্ধি: ব্যায়াম রক্ত ​​সঞ্চালন বাড়ায়, যা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুতে অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করে এবং ফোলাভাব(due to inflammation) কমাতে সাহায্য করে। এটি প্রাকৃতিক নিরাময় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
৪. ব্যথা উপশম: ব্যায়াম মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন (প্রাকৃতিক ব্যথানাশক) নিঃসরণে সাহায্য করে, যা ব্যথা কমাতে সহায়ক। এছাড়াও, এটি ব্যথার ভয় কমাতে এবং নড়াচড়ার প্রতি আস্থা বাড়াতে সাহায্য করে।
৫. সঠিক অঙ্গভঙ্গি (Posture) বজায় রাখা: দুর্বল পেশী এবং ভুল অঙ্গভঙ্গি কোমর ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। ব্যায়াম সঠিক অঙ্গভঙ্গি বজায় রাখতে এবং মেরুদণ্ডের উপর চাপ কমাতে সহায়ক।

৬. পুনরাবৃত্তি রোধ: নিয়মিত ব্যায়াম শুধু বর্তমান ব্যথা কমাতেই নয়, ভবিষ্যতে কোমর ব্যথা ফিরে আসার সম্ভাবনা কমাতেও সাহায্য করে।

কী ধরনের ব্যায়াম কার্যকর?
কোমর ব্যথার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম রয়েছে।
কিছু সাধারণ এবং কার্যকর ব্যায়ামগুলো হলো:
* পেলভিক টিল্ট (Pelvic Tilt): চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পা মাটিতে রেখে কোমরকে হালকাভাবে উপরে তোলা এবং নামানো।
* নীজ টু চেস্ট (Knees to Chest): চিত হয়ে শুয়ে একটি বা দুটি হাঁটু বুকের দিকে টেনে ধরা।
* লোয়ার ব্যাক রোটেশন (Lower Back Rotation): চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পা মাটিতে রেখে হাঁটু দুটিকে একপাশে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
* ব্রিজ পোজ (Bridge Pose): চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পা মাটিতে রেখে কোমরকে মাটি থেকে উপরে তুলে ধনুকের মতো আকৃতি তৈরি করা।
* ক্যাট-ক্যামেল (Cat-Camel): হাত ও হাঁটুর উপর ভর করে বিড়াল ও উটের মতো করে মেরুদণ্ডকে ওঠানামা করানো।

* ওয়াকিং (Walking): নিয়মিত হাঁটা কোমরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি রক্ত ​​সঞ্চালন বাড়ায় এবং সামগ্রিক পেশী শক্তি বজায় রাখে।

 

কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলী:

* ধীরে শুরু করুন: হঠাৎ করে কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে ধীরে ধীরে শুরু করুন এবং শরীরকে অভ্যস্ত হতে দিন।
* ব্যথা হলে থামুন: যদি কোনো ব্যায়াম করার সময় ব্যথা বাড়ে, তাহলে তৎক্ষণাৎ সেটি বন্ধ করুন ।
* নিয়মিত অনুশীলন: সর্বোত্তম ফলাফলের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি।
* সঠিক কৌশল: ব্যায়াম সঠিক কৌশল মেনে করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল কৌশল হিতে বিপরীত ফল দিতে পারে।

* অতিরিক্ত ওজন কমানো: অতিরিক্ত ওজন কোমরের উপর বাড়তি চাপ ফেলে। ব্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।

ব্যায়ামের সুবিধা:
* কম ঝুঁকিপূর্ণ,
* প্রাকৃতিক নিরাময়: ব্যায়াম শরীরের নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে।
* খরচ কম: ব্যায়ামের খরচ অনেক কম।
* জীবনযাত্রার উন্নতি: ব্যায়াম কেবল ব্যথা কমায় না, বরং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।

* দীর্ঘমেয়াদী সমাধান: অনেক ক্ষেত্রে, ব্যায়াম কোমর ব্যথার একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান প্রদান করে।

পরিশেষে বলা যায়, কোমর ব্যথার চিকিৎসায় ব্যায়াম একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর উপায়। তবে, প্রতিটি রোগীর অবস্থা ভিন্ন হওয়ায়, একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।।

Leave a Comment

Scroll to Top