ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

হেমিফেসিয়াল স্প্যাজম (Hemifacial Spasm)

হেমিফেসিয়াল স্প্যাজম (Hemifacial Spasm) হলো একটি স্নায়ুতন্ত্রের অবস্থা যেখানে মুখের একপাশের মাংসপেশিগুলো অনৈচ্ছিকভাবে কেঁপে ওঠে। এর প্রধান কারণ হলো একটি রক্তনালী মুখের স্নায়ুর (facial nerve) উপর চাপ সৃষ্টি করা। এর ফলে মুখের একপাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাপুনি হয়, যা সাধারণত চোখের পাতা থেকে শুরু হয়ে গাল এবং মুখের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এটি সাধারণত গুরুতর নয়, তবে এটি অস্বস্তিকর হতে পারে এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সার্জিক্যাল চিকিৎসা: মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশন (Microvascular Decompression – MVD)
হেমিফেসিয়াল স্প্যাজমের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে মাইক্রোভাসকুলার ডিকম্প্রেশন (MVD) সার্জারিকে বিবেচনা করা হয়। এই সার্জারির লক্ষ্য হলো মুখের স্নায়ুর উপর যে রক্তনালীটি চাপ সৃষ্টি করছে, সেটিকে সরিয়ে স্নায়ুকে চাপমুক্ত করা।

MVD সার্জারির পদ্ধতি:
১. সাধারণ অ্যানাস্থেসিয়া: রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করা হয়।
২. ছোট ছিদ্র: কানের পেছনের দিকে একটি ছোট (incision) দেওয়া হয় এবং খুলিতে প্রায় এক থেকে দুই ইঞ্চি পরিমাণ ছোট একটি ছিদ্র করা হয়।
৩. স্নায়ু ও রক্তনালী শনাক্তকরণ:আমরা (নিউরোসার্জন) একটি মাইক্রোস্কোপ বা এন্ডোস্কোপ ব্যবহার করে মুখের স্নায়ু (facial nerve) এবং তার উপর চাপ সৃষ্টিকারী রক্তনালীটি (Anterior inferior cerebellar artery, AICA) খুঁজে বের করি। এই সময় মস্তিষ্ক এবং সেরিবেলামের (cerebellum) মাঝখানে কাজ করার জন্য সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) বের করে মস্তিষ্ককে কিছুটা শিথিল করা হয়।
৪. ডিকম্প্রেশন: একবার রক্তনালীটি চিহ্নিত হলে, এটিকে স্নায়ু থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়। রক্তনালী এবং স্নায়ুর মাঝে একটি ছোট টেফলন প্যাড (teflon pad) বা স্পঞ্জ স্থাপন করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে রক্তনালীটি আবার স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি না করে। কিছু ক্ষেত্রে, পেশী (muscle) বা চর্বির (fat) টুকরাও ব্যবহার করা যেতে পারে।

MVD সার্জারির সুবিধা:
* স্থায়ী সমাধান: এটি হেমিফেসিয়াল স্প্যাজমের একমাত্র স্থায়ী চিকিৎসা।
* উচ্চ সাফল্যের হার: প্রায় ৮৫% থেকে ৯৭% ক্ষেত্রে এই সার্জারি সফল হয় এবং রোগীদের উপসর্গ থেকে দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি মেলে।
* তাত্ক্ষণিক বা ধীরে ধীরে উন্নতি: অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সার্জারির পরপরই কাপুনি বন্ধ হয়ে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে কয়েক দিন বা সপ্তাহ লেগে যেতে পারে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে।

MVD সার্জারির ঝুঁকি ও জটিলতা:
অন্যান্য যেকোনো সার্জারির মতো MVD-এরও কিছু ঝুঁকি আছে, যদিও বেশিরভাগ জটিলতা বিরল:
* ফ্যাসিয়াল দুর্বলতা বা অসাড়তা: মুখের কিছু অংশে সাময়িক বা স্থায়ী দুর্বলতা বা অসাড়তা হতে পারে।
* শ্রবণশক্তি হ্রাস: শ্রবণশক্তির স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটি হতে পারে। সার্জারির সময় শ্রবণ স্নায়ু পর্যবেক্ষণ করা হয়।
* ভারসাম্যের সমস্যা: কিছু ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।
* CSF লিক (Cerebrospinal Fluid leak): খুব বিরল ক্ষেত্রে (প্রায় ১%) মস্তিষ্কের তরল লিক হতে পারে, যার জন্য দ্বিতীয় একটি ছোট সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
* সংক্রমণ বা রক্তপাত: যেকোনো সার্জারির মতোই সংক্রমণ বা রক্তপাতের ঝুঁকি থাকে।
* স্ট্রোক: অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে স্ট্রোক হতে পারে।

সার্জারির পর সুস্থতা:
* হাসপাতালের সময়কাল: বেশিরভাগ রোগী সার্জারির ২-৩ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান।
* প্রাথমিক সুস্থতা: সার্জারির পরের দিন থেকেই রোগীরা চলাফেরা করতে পারেন।
* পূর্ণ সুস্থতা: বেশিরভাগ রোগীর খিঁচুনি সার্জারির পরপরই বন্ধ হয়ে যায়। তবে, কিছু ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লেগে যেতে পারে উপসর্গগুলো সম্পূর্ণরূপে দূর হতে। সাধারণত, সার্জারির পর ৮৫% এর বেশি রোগী উপসর্গ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পান।

Leave a Comment

Scroll to Top