ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া (Fibrous Dysplasia of Frontal Bone)

​ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া হলো একটি বিরল, অ-ক্যান্সারজনিত হাড়ের রোগ, যেখানে স্বাভাবিক হাড়ের টিস্যু ধীরে ধীরে তন্তুযুক্ত (fibrous) টিস্যু এবং অপরিপক্ক, অসংগঠিত হাড় দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। এটি শরীরের যেকোনো হাড়ে ঘটতে পারে, তবে মাথার খুলি ও মুখের হাড়ে প্রায়শই দেখা যায়। যখন এটি ফ্রন্টাল বোনে (কপালের হাড়) হয়, তখন এটিকে ফ্রন্টাল বোনে ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া বলা হয়। এই রোগের ফলে হাড় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা মুখের বিকৃতি, দৃষ্টি সমস্যা এবং অন্যান্য স্নায়বিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।



কেন সার্জারি প্রয়োজন?
​ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়ার জন্য সার্জারি সাধারণত নিম্নলিখিত কারণে করা হয়:
​মুখের বিকৃতি (Cosmetic Deformity): যখন অস্বাভাবিক হাড়ের বৃদ্ধি কসমেটিক সমস্যা তৈরি করে ।
​দৃষ্টিশক্তির সমস্যা (Visual Impairment): ফ্রন্টাল বোনে বৃদ্ধির ফলে এটি চোখের চারপাশে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা দৃষ্টিশক্তি হ্রাস বা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
​ব্যথা (Pain): যদি টিউমারটি স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
​অন্যান্য স্নায়বিক জটিলতা: টিউমারের আকার বৃদ্ধির কারণে এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা স্নায়ুর উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে।



​সার্জারির উদ্দেশ্য
​ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া সার্জারির প্রধান উদ্দেশ্য হলো:
​টিউমার অপসারণ: যতটা সম্ভব অস্বাভাবিক হাড়ের অংশটি অপসারণ করা।
​কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার: চোখের উপর থেকে চাপ সরানো এবং স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা।
​কসমেটিক উন্নতি: মুখের স্বাভাবিক আকৃতি ফিরিয়ে আনা।



সার্জারির প্রকারভেদ
​ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া সার্জারিতে মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
​কন্টোউরিং বা শেপিং (Contouring or Shaving):
​এটি হালকা বা মাঝারি আকারের টিউমারের জন্য উপযুক্ত।
​এই পদ্ধতিতে সার্জন হাড়ের অতিরিক্ত অংশটি সাবধানে ছেঁটে ফেলেন বা আকৃতি দেন যাতে মুখের স্বাভাবিক রূপ ফিরে আসে।
​এই পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক।
অ্যাব্লেশন ও পুনর্গঠন (Ablation and Reconstruction):
​এটি বড় বা জটিল টিউমারের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে হাড়ের একটি বড় অংশ অপসারণ করা প্রয়োজন।
​অ্যাব্লেশন: এই ধাপে সার্জন আক্রান্ত হাড়ের অংশটি সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করেন।
​পুনর্গঠন: অপসারণের পর, হাড়ের সেই স্থানটি পুনর্গঠন করা হয়। এর জন্য সাধারণত অন্য কোনো হাড়ের অংশ (যেমন, পাঁজরের হাড় বা ইলিয়াক ক্রেস্ট) বা কৃত্রিম উপাদান (যেমন, টাইটানিয়াম প্লেট,PEEK) ব্যবহার করা হয়। এটি মুখের সঠিক আকৃতি এবং গঠন বজায় রাখতে সাহায্য করে।



সার্জারির ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ
​ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া সার্জারিতে কিছু নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকে:
​রক্তপাত: মস্তিষ্কের কাছাকাছি সংবেদনশীল অঞ্চলে সার্জারি হওয়ায় রক্তপাতের ঝুঁকি থাকে।
​সংক্রমণ: যেকোনো সার্জারির মতোই সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
​পুনরাবৃত্তি (Recurrence): যেহেতু ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়া অপসারণের পরেও এটি আবার বেড়ে উঠতে পারে।
​স্নায়ুর ক্ষতি: সার্জারির সময় চোখের বা মুখের স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে, যা কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী হতে পারে।

প্রাক-অপারেটিভ এবং পোস্ট-অপারেটিভ যত্ন
​প্রাক-অপারেটিভ (সার্জারির আগে):
​সার্জারির আগে সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই করে টিউমারের সঠিক আকার এবং অবস্থান নির্ণয় করা হয়।
​সার্জন রোগীর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং সার্জারির পরিকল্পনা করেন।
​পোস্ট-অপারেটিভ (সার্জারির পরে):
​রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
​ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ দেওয়া হয়।
​সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
​রোগীকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফলো-আপের জন্য আসতে বলা হয়, যাতে টিউমারের পুনরাবৃত্তি হয়েছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

উপসংহার
​ফাইব্রাস ডিস্প্লাসিয়ার সার্জারি একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া, যা অভিজ্ঞ নিউরোসার্জন দ্বারা সম্পন্ন হওয়া উচিত। যদিও সার্জারি মুখের রূপ এবং কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে রোগের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই দীর্ঘমেয়াদী ফলো-আপ অপরিহার্য। এটি একটি চ্যালেঞ্জিং রোগ হলেও, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে সফলভাবে এর মোকাবিলা করা সম্ভব।

Leave a Comment

Scroll to Top