এক্সট্রাডুরাল হেমাটোমা (Epidural Hematoma - EDH)
এক্সট্রাডুরাল হেমাটোমা হলো একটি মারাত্মক নিউরোসার্জিক্যাল অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্ক ও খুলি (স্কাল) এর মধ্যে অবস্থিত এপিডুরাল স্পেসে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এটি সাধারণত মাথায় আঘাতের ফলে ঘটে এবং দ্রুত চিকিৎসা না করালে জীবনহানির কারণ হতে পারে।
এক্সট্রাডুরাল হেমাটোমার কারণ:
এটি সাধারণত মাথার গুরুতর আঘাতের ফলে ঘটে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিডল মেনিনজিয়াল আর্টারি বা অন্য কোনো রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মূল কারণসমূহ হলো:
1. ট্রমাটিক হেড ইনজুরি:
সড়ক দুর্ঘটনা
উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া
ক্রীড়া সংক্রান্ত আঘাত(Sports injury)
সংঘর্ষ বা মারামারি
2. ফ্র্যাকচার:
টেম্পোরাল বা পারাইটাল হাড় ভেঙে গেলে মিডল মেনিনজিয়াল আর্টারি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
3. নিওপ্লাজম বা ব্লিডিং ডিসঅর্ডার:
খুব কম ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা (হেমোফিলিয়া) থেকেও এটি হতে পারে।
রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ
এক্সট্রাডুরাল হেমাটোমার উপসর্গ সাধারণত মাথায় আঘাতের পরপরই দেখা যায়, তবে কখনও কখনও কিছু সময় পরেও লক্ষণগুলো প্রকট হতে পারে।


প্রাথমিক উপসর্গ:
মাথাব্যথা (ধীরে ধীরে তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে পারে)
বমি বমি ভাব বা বমি
সময় ও স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি
চোখে দেখার সমস্যা (দ্বৈত দৃষ্টি, ঝাপসা দেখা)
শরীরের এক পাশে দুর্বলতা বা অবশ ভাব


গুরুতর উপসর্গ:
সচেতনতা হারানো (লুসিড ইন্টারভাল lucid interval) : কিছু সময় ভালো থাকার পর হঠাৎ অবস্থার অবনতি)
খিঁচুনি
শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা
পরিবেশ সম্পর্কে অনুধাবন হারানো
পিউপিল (চোখের মণি) অসমান হয়ে যাওয়া।
রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি
১. নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষাঃ
গ্লাসগো কোমা স্কেল (GCS) ব্যবহার করে রোগীর স্নায়বিক অবস্থার মূল্যায়ন করা হয়।
২. ইমেজিং টেস্টঃ
CT স্ক্যান (Computed Tomography):
এক্সট্রাডুরাল হেমাটোমা নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। এতে বাইকনভেক্স (লেন্স-আকৃতির) হেমাটোমা দেখা যায়।
MRI (Magnetic Resonance Imaging):
কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে যখন ধীর রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
১. পর্যবেক্ষণ (Conservative Management):
যদি হেমাটোমা ছোট হয় এবং উপসর্গ কম থাকে, তাহলে পর্যবেক্ষণ ও ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
২. সার্জারি (Surgical Management):
ক্রানিওটমি (Craniotomy):বড় হেমাটোমা বা গুরুতর অবস্থায় এটি করা হয়। খুলির একটি অংশ কেটে রক্ত জমাট অপসারণ করা হয়।
বার হোল (Burr Hole Evacuation):
যদি রক্তক্ষরণ কম হয় বা ক্রনিক রক্তক্ষরণ হয়, তবে ছোট ছিদ্র করে জমাট রক্ত বের করে ফেলা হয়।
৩. সাপোর্টিভ কেয়ার:
অ্যান্টি-সিজার ওষুধ: খিঁচুনি প্রতিরোধে
ওসমোটিক ডিউরেটিক্স (যেমন ম্যানিটল): মস্তিষ্কের চাপ কমানোর জন্য
ভেন্টিলেটরি সাপোর্ট: যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হয়


প্রতিরোধের উপায়
হেলমেট পরা: বাইক বা খেলাধুলার সময়
বাড়িতে ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ
ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় সুরক্ষা গিয়ার ব্যবহার
শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
প্রতিক্রিয়া ও জটিলতা:
যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে হতে পারে:
স্থায়ী নিউরোলজিক্যাল ড্যামেজ
কোমা
মৃত্যু
তবে দ্রুত চিকিৎসা পেলে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
এক্সট্রাডুরাল হেমাটোমা একটি জীবনহানিকর অবস্থা, যা সাধারণত মাথায় আঘাতজনিত কারণে হয়ে থাকে। সঠিক সময়ে সনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসা নিলে সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। তাই মাথায় গুরুতর আঘাত লাগলে অবিলম্বে নিউরোসর্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।