ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমা (Craniopharyngioma)
ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমা (Craniopharyngioma) একটি বিরল ধরনের মস্তিষ্কের টিউমার যা সাধারণত পিটুইটারি গ্রন্থি এবং হাইপোথ্যালামাসে হয়। এটি সাধারণত Benign (ক্যান্সার নয়) এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না। তবে, এটি ধীর গতিতে বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন পিটুইটারি গ্রন্থি, অপটিক স্নায়ু (দৃষ্টিশক্তির জন্য দায়ী) এবং হাইপোথ্যালামাস (হরমোন নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে) এর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার কারণ:
ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে, এটি ভ্রূণের বিকাশের সময় Rathkeys pouch টিস্যুর অবশিষ্টাংশ থেকে উদ্ভূত হয় বলে মনে করা হয়। এই টিস্যুগুলো সাধারণত জন্মগতভাবে পিটুইটারি গ্রন্থি তৈরি করে। কিছু ক্ষেত্রে, এই কোষগুলিতে মিউটেশন (পরিবর্তন) দেখা দিলে টিউমার তৈরি হতে পারে।
এটি জেনেটিক বা বংশগত রোগ নয়। এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে সাধারণত ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু এবং ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার লক্ষণ:
টিউমারটি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের সংলগ্ন অংশে চাপ সৃষ্টি করলে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। লক্ষণগুলি টিউমারের আকার এবং অবস্থানের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো:
* মাথাব্যথা: সাধারণত গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা।
* দৃষ্টি সমস্যা: দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, দ্বৈত দৃষ্টি (double vision), একপাশের দৃষ্টি (peripheral vision) কমে যাওয়া।
* হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: পিটুইটারি গ্রন্থিকে প্রভাবিত করার কারণে বিভিন্ন হরমোনের অভাব বা অতিরিক্ত উৎপাদন হতে পারে। এর ফলে শিশুদের বৃদ্ধি ধীর হওয়া বা বয়ঃসন্ধি দেরিতে হওয়া, ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও প্রস্রাব, ক্লান্তি, রক্তচাপ কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।
* বমি বমি ভাব এবং বমি: মস্তিষ্কের উপর চাপ বাড়ার কারণে হতে পারে।
* ভারসাম্যহীনতা বা হাঁটার সমস্যা: টিউমারের অবস্থানের উপর নির্ভর করে এটি হতে পারে।
* মেজাজ পরিবর্তন বা আচরণগত পরিবর্তন: হাইপোথ্যালামাস প্রভাবিত হলে এটি হতে পারে।
* অতিরিক্ত ঘুম: দিনভর ক্লান্তি বা অতিরিক্ত ঘুম।
ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার রোগ নির্ণয়:
লক্ষণগুলি দেখে সন্দেহ হলে ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে রয়েছে:
* ইমেজিং পরীক্ষা:
* এমআরআই (MRI): এটি টিউমারের আকার, অবস্থান এবং বৈশিষ্ট্য ভালোভাবে দেখতে সাহায্য করে।
* সিটি স্ক্যান (CT Scan): এটি টিউমারের মধ্যে ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি দেখতে সাহায্য করে।
ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার চিকিৎসা:
ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো অস্ত্রোপচার। টিউমারের আকার, অবস্থান, রোগীর বয়স এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসার পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়।
* অস্ত্রোপচার (Surgery): বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টিউমার অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়।
* ওপেন ক্র্যানিওটমি (Open craniotomy): মাথার খুলি খুলে টিউমার অপসারণ করা হয়।
* মিনিম্যালি ইনভেসিভ ট্রান্সস্ফিনয়েডাল পদ্ধতি (Minimally invasive transsphenoidal procedure): নাক দিয়ে বিশেষ যন্ত্র ঢুকিয়ে টিউমার অপসারণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের উপর কম প্রভাব পড়ে।
অনেক সময় টিউমার সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর কাছাকাছি থাকার কারণে সম্পূর্ণ অপসারণ সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে যতটা সম্ভব টিউমার অপসারণ করা হয় এবং বাকি অংশের জন্য অন্য চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
* থেরাপি (Radiation Therapy): অস্ত্রোপচারের পর যদি টিউমারের অংশ থেকে যায় বা যদি অস্ত্রোপচার সম্ভব না হয়, তবে থেরাপি ব্যবহার করা হয়। এটি টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
* কেমোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি: কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে, যদিও এগুলো ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমার প্রধান চিকিৎসা নয়।
* হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি: টিউমারের কারণে হরমোনের ঘাটতি হলে হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে।
ক্র্যানিওফ্যারিঞ্জিওমা একটি নিরীহ টিউমার হলেও, এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশের উপর চাপ সৃষ্টি করায় এর চিকিৎসা জটিল হতে পারে। সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় এবং সময় মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।