ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

অ্যারাকনয়েড সিস্ট(Arachnoid Cyst)

অ্যারাকনয়েড সিস্ট(Arachnoid Cyst) হলো মস্তিষ্কের বা মেরুদণ্ডের চারপাশে থাকা অ্যারাকনয়েড মেমব্রেনের (যা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডকে ঘিরে থাকা তিনটি স্তরের একটি) মধ্যে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) দ্বারা ভরা এক ধরনের থলি। বেশিরভাগ অ্যারাকনয়েড সিস্ট জন্মগত (অর্থাৎ জন্মের সময় থেকেই থাকে), তবে আঘাত, সংক্রমণ বা অন্যান্য অস্ত্রোপচারের কারণেও এগুলো তৈরি হতে পারে। বেশিরভাগ অ্যারাকনয়েড সিস্ট কোনো উপসর্গ তৈরি করে না এবং সেগুলোর চিকিৎসার প্রয়োজনও হয় না। তবে, যখন সিস্ট বড় হয় বা মস্তিষ্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং সেক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

অ্যারাকনয়েড সিস্ট সার্জারির প্রয়োজনীয়তা
সাধারণত, ছোট এবং উপসর্গহীন অ্যারাকনয়েড সিস্টের ক্ষেত্রে কেবল নিয়মিত পর্যবেক্ষণের (regular monitoring) মাধ্যমে এর বৃদ্ধি বা উপসর্গের বিকাশ লক্ষ্য করা হয়। তবে, যখন সিস্টের আকার বৃদ্ধি পায় এবং নিম্নলিখিত উপসর্গ দেখা দেয়, তখন সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে:
* তীব্র মাথাব্যথা
* বমি বমি ভাব বা বমি
* খিঁচুনি
* দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
* মাথার আকার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া (বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে)
* শারীরিক দুর্বলতা বা ভারসাম্যহীনতা

* হাইড্রোকেফালাস (মস্তিষ্কে অতিরিক্ত CSF জমা হওয়া)

অ্যারাকনয়েড সিস্ট সার্জারির পদ্ধতি:
অ্যারাকনয়েড সিস্ট সার্জারির প্রধান লক্ষ্য হলো সিস্টের মধ্যে জমে থাকা তরল নিষ্কাশন করে মস্তিষ্কের উপর থেকে চাপ কমানো। বিভিন্ন ধরনের সার্জারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা সিস্টের আকার, অবস্থান এবং উপসর্গের তীব্রতার উপর নির্ভর করে:
১. এন্ডোস্কোপিক ফেনস্ট্রেশন (Endoscopic Fenestration): Minimally invasive পদ্ধতি।
এই পদ্ধতিতে, নিউরোসার্জন মাথার একটি ছোট ছিদ্র করে একটি এন্ডোস্কোপ (ক্যামেরা এবং আলো সহ একটি পাতলা নল) মস্তিষ্কের মধ্যে প্রবেশ করান।এন্ডোস্কোপের সাহায্যে সিস্টের দেয়ালে ছোট ছোট ছিদ্র (fenestrations) তৈরি করা হয়।এই ছিদ্রগুলোর মাধ্যমে সিস্টের ভিতরের তরল মস্তিষ্কের স্বাভাবিক CSF প্রবাহের সাথে মিশে যায় এবং শরীর দ্বারা শোষিত হয়।
* সুবিধা: কম আঘাত ও দাগ, দ্রুত আরোগ্য লাভ ।
২. ক্রেনিওটমি সহ ফেনস্ট্রেশন (Craniotomy with Fenestration):যখন এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতি সম্ভব হয় না বা সিস্ট খুব বড় বা জটিল স্থানে থাকে, তখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।এতে মাথার খুলির একটি ছোট অংশ (bone flap) অপসারণ করা হয় যাতে নিউরোসার্জন সিস্টে সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন।অস্ত্রোপচারের পর খুলির অংশটি আবার প্রতিস্থাপন করা হয়। এটি এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতির চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক এবং এর আরোগ্য লাভের সময়ও বেশি লাগতে পারে।
৩. শান্টিং (Shunting):
কিছু ক্ষেত্রে, যখন সিস্ট থেকে তরল বারবার জমা হয় বা অন্য কোনো পদ্ধতি সফল হয় না, তখন শান্ট বসানো হয়। একটি শান্ট হলো একটি পাতলা টিউব, যা সিস্টের মধ্যে স্থাপন করা হয়।এই টিউবটি শরীরের অন্য কোনো অংশে (যেমন পেটের ক্যাভিটি বা হৃদপিণ্ডের অলিন্দে) নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অতিরিক্ত তরল শোষিত হতে পারে। এই শান্ট সাধারণত স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়।
৪. সিস্ট রিকশন বা অপসারণ (Cyst Resection/Excision):মেরুদণ্ডের অ্যারাকনয়েড সিস্টের ক্ষেত্রে অনেক সময় সম্পূর্ণ সিস্টটি অপসারণ করা হয়।
* বিরল ক্ষেত্রে, মস্তিষ্কের কিছু অ্যারাকনয়েড সিস্টও সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা হতে পারে, বিশেষ করে যদি সিস্টটি ছোট এবং সহজে অ্যাক্সেসযোগ্য হয়।
* সাফল্যের হার এবং আরোগ্য লাভ:
অ্যারাকনয়েড সিস্ট সার্জারির সাফল্যের হার নির্ভর করে সিস্টের ধরন, আকার, অবস্থান এবং রোগীর সাধারণ স্বাস্থ্যের উপর। সাধারণত, যখন সঠিক indication থাকে, তখন এই সার্জারিগুলো উপসর্গ উপশম এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বেশ সফল হয়।
* আরোগ্য লাভ: এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে আরোগ্য লাভের সময় কম লাগে এবং রোগী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। ক্রেনিওটমি বা শান্ট বসানোর ক্ষেত্রে আরোগ্য লাভের সময় বেশি লাগতে পারে।

* ফলো-আপ: অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত ফলো-আপ এবং এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করে সিস্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

অ্যারাকনয়েড সিস্টের চিকিৎসা একজন নিউরোসার্জন করে থাকেন, যিনি রোগীর অবস্থা পর্যালোচনা করে সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

Leave a Comment

Scroll to Top