ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

লো-গ্রেড গ্লিওমা (Low-Grade Glioma - LGG)

লো-গ্রেড গ্লিওমা (Low-Grade Glioma – LGG) হলো মস্তিষ্কের টিউমার যা মস্তিষ্কের সহায়ক কোষ (গ্লিয়াল সেল) থেকে তৈরি হয়। এগুলি সাধারণত ধীর গতিতে বৃদ্ধি পায়, তবে সময়ের সাথে সাথে এগুলি আরও আগ্রাসী (উচ্চ-গ্রেডের) হতে পারে। সার্জারি লো-গ্রেড গ্লিওমার চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



সার্জারির উদ্দেশ্য:
লো-গ্রেড গ্লিওমা(LGG) সার্জারির প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:
* রোগ নির্ণয় (Diagnosis): অনেক সময় টিউমারের ধরন ও প্রকৃতি নিশ্চিত করার জন্য বায়োপসি (biopsy) প্রয়োজন হয়, যা সার্জারির মাধ্যমে করা যেতে পারে।
* সর্বাধিক সম্ভব টিউমার অপসারণ (Maximal Safe Resection): নিউরোসার্জনরা যতটা সম্ভব টিউমারের অংশ অপসারণ করার চেষ্টা করেন, যাতে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারিতার (যেমন – কথা বলা, নড়াচড়া, স্মৃতিশক্তি) ক্ষতি না হয়। কিছু ক্ষেত্রে, সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ সম্ভব না হলেও, আংশিক অপসারণও রোগের অগ্রগতি ধীর করতে এবং লক্ষণগুলি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
* লক্ষণ উপশম (Symptom Relief): টিউমারের কারণে সৃষ্ট চাপ বা অন্যান্য লক্ষণ, যেমন – মাথাব্যথা, খিঁচুনি, দুর্বলতা ইত্যাদি উপশম করা।



সার্জারির প্রকারভেদ:
লো-গ্রেড গ্লিওমা অপসারণের জন্য সাধারণত যে সার্জারি পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয় তা হলো ক্র্যানিওটমি (Craniotomy) এবং টিউমার এক্সেশন(Tumor excision) :এই পদ্ধতিতে:
* মাথার চামড়া কাটা (incision) হাড্ডি কেটে হয়।
* খুলিতে একটি মাইক্রোস্কোপের নিচেঅস্থায়ী খোলা অংশ তৈরি করে মস্তিষ্কে পৌঁছানো হয়।
* অত্যন্ত ছোট মাইক্রোসার্জিক্যাল যন্ত্র ব্যবহার করে মাইক্রোস্কোপের নিচে টিউমার অপসারণ করা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে, সার্জারির সময় আরও উন্নত কৌশল ব্যবহার করা হয়:
* এওয়েক ক্র্যানিওটমি (Awake Craniotomy): এই পদ্ধতিতে রোগী সার্জারির সময় আংশিকভাবে জাগ্রত থাকেন। নিউরোসার্জনরা রোগীর সাথে কথা বলে বা কিছু নির্দিষ্ট কাজ (যেমন – আঙুল নাড়ানো) করতে বলে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করেন। এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ক্ষতি কমানোর জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
* নিউরোনেভিগেশন (Neuronavigation) এবং ফাংশনাল এমআরআই (Functional MRI – fMRI): সার্জারির আগে fMRI এবং ডিটিআই (DTI) ম্যাপিং ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কোন অংশগুলি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে তা চিহ্নিত করা হয়। নিউরোনেভিগেশন সার্জনের জন্য রিয়েল-টাইম গাইডেন্স প্রদান করে, যা টিউমার অপসারণে নির্ভুলতা বাড়ায়।
* ইন্ট্রাঅপারেটিভ ব্রেইন ম্যাপিং (Intraoperative Brain Mapping): সার্জারির সময় মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যাতে টিউমার অপসারণের সময় সেগুলোর ক্ষতি এড়ানো যায়।



ঝুঁকি এবং জটিলতা:
যে কোনো মস্তিষ্কের সার্জারির মতোই, লো-গ্রেড গ্লিওমা সার্জারিতেও কিছু ঝুঁকি ও জটিলতা থাকতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:
* রক্তপাত (Hemorrhage)
* সংক্রমণ (Infection)
* মস্তিষ্কের ফোলা (Brain swelling – Oedema)
* নতুন বা খারাপ হওয়া স্নায়বিক দুর্বলতা (Neurological deficits): যেমন – কথা বলায় সমস্যা, দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তির সমস্যা, ভারসাম্যহীনতা। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই দুর্বলতা সাময়িক হয় এবং কয়েক মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।
* খিঁচুনি (Seizures): যদিও অনেক লো-গ্রেড গ্লিওমার ক্ষেত্রে খিঁচুনিই প্রাথমিক লক্ষণ হয়, সার্জারির পরেও খিঁচুনি হতে পারে।
* রক্ত জমাট বাঁধা (Blood clots)
সার্জারির পরের যত্ন ও সুস্থতা (Recovery):
সার্জারির পর কয়েকদিন থেকে এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। সুস্থতার প্রক্রিয়া ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
* প্রাথমিক সুস্থতা: সার্জারির পর মস্তিষ্কের ফোলা কমানোর জন্য স্টেরয়েড এবং খিঁচুনি প্রতিরোধের জন্য ঔষধ দেওয়া হতে পারে।
* দৈনন্দিন কাজে ফেরা: রোগীরা সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে হাঁটাচলা এবং ব্যক্তিগত যত্ন শুরু করতে পারেন। তবে, ৪-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত strenuous activity বা ভারী কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা হয়।
* পুনর্বাসন (Rehabilitation): ফিজিওথেরাপি এবং স্পিচ থেরাপি (যদি প্রয়োজন হয়) মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ফিরে পেতে সাহায্য করতে পারে।
* দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ: সার্জারির পরে নিয়মিত এমআরআই স্ক্যান এবং ফলো-আপের প্রয়োজন হয়, যাতে টিউমারের পুনরাবৃত্তি বা উচ্চ-গ্রেডে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সার্জারির ফলাফল এবং পূর্বাভাস (Prognosis):
লো-গ্রেড গ্লিওমা সার্জারির পর prognosis বেশ ভালো হতে পারে, বিশেষ করে যদি টিউমার সম্পূর্ণ বা বেশিরভাগ অংশ অপসারণ করা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত এবং কার্যকরী সার্জারি জীবনকাল বাড়াতে এবং খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে। যদিও লো-গ্রেড গ্লিওমা সাধারণত ধীর গতিতে বৃদ্ধি পায়, তবুও এটি সময়ের সাথে সাথে উচ্চ-গ্রেডে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নিয়মিত ফলো-আপ এবং প্রয়োজনে অন্যান্য চিকিৎসা,যেমন – রেডিয়েশন থেরাপি বা কেমোথেরাপি, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে এ ধরনের ব্রেইন টিউমারের বিশ্বমানের সার্জারি নিয়মিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে নিউরোগ্লিওমাসার্জনের সাথে আলোচনা করে আপনার জন্য সেরা চিকিৎসার পরিকল্পনা করা উচিত।

Leave a Comment

Scroll to Top