ডাঃ হাফিজ আসিফ রায়হান

বার্টোলোটি সিন্ড্রোম (Bertolotti Syndrome)

বার্টোলোটি সিন্ড্রোম (Bertolotti Syndrome) হল মেরুদণ্ডের একটি জন্মগত অবস্থা যা পিঠের নিচের অংশে ব্যথা সৃষ্টি করে। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মেরুদণ্ডের সবচেয়ে নিচের অংশের কশেরুকা (L5) sacrum বা ইলিয়াম (ilium) এর সাথে অস্বাভাবিকভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক সংযোগের ফলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয় এবং ব্যথার সৃষ্টি হয়।



কারণ:
বার্টোলোটি সিন্ড্রোম একটি জন্মগত ত্রুটি। এর মূল কারণ হল লাম্বোস্যাক্রাল ট্রানজিশনাল ভার্টিব্রা (Lumbosacral Transitional Vertebra – LSTV) নামক একটি অস্বাভাবিক কশেরুকার উপস্থিতি। এই LSTV একপাশে বা উভয়পাশে Sacrum এর সাথে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে সংযুক্ত হতে পারে। এই অস্বাভাবিক সংযোগের কারণে মেরুদণ্ডে চাপের সৃষ্টি হয়, যা ব্যথা এবং অন্যান্য সমস্যার কারণ হতে পারে।



লক্ষণ:
বার্টোলোটি সিন্ড্রোমের লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, এবং অনেকেই কোনো লক্ষণ নাও অনুভব করতে পারেন। তবে, সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:
* পিঠের নিচের অংশে ব্যথা: এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। ব্যথা সাধারণত একপাশে বেশি হয় এবং কার্যকলাপের সাথে বাড়তে পারে।
* নিতম্ব বা পা পর্যন্ত ব্যথার বিকিরণ(Radiating Pain) : ব্যথা নিতম্ব বা পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে, যা সায়াটিকার (Sciatica) মতো মনে হতে পারে।
* পিঠের নিচের অংশে শক্তভাব: নমনীয়তা কমে যেতে পারে, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বা দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় থাকার পর।
* অসাড়তা বা ঝিনঝিন করা: পায়ের পাশে অসাড়তা বা ঝিনঝিন অনুভূতি হতে পারে।

শনাক্তকরণ:
বার্টোলোটি সিন্ড্রোম নির্ণয়ের জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করা হয়:
* শারীরিক পরীক্ষা: ডাক্তার রোগীর পিঠের ব্যথা, নড়াচড়ার সীমা এবং স্পর্শকাতরতা(SLR, FAIR, FABER) পরীক্ষা করেন।
* এক্স-রে (X-ray): মেরুদণ্ডের এক্স-রে সাধারণত এই অস্বাভাবিক কশেরুকা বা সংযোগ সনাক্ত করতে সাহায্য করে।
* সিটি স্ক্যান (CT Scan) : এই পরীক্ষাগুলো মেরুদণ্ডের হাড় এর বিস্তারিত ছবি প্রদান করে, যা রোগ নির্ণয়ে আরও সাহায্য করে।
* ইনজেকশন (Diagnostic Injection): ব্যথা ঠিক কোন জায়গা থেকে আসছে তা নির্ণয়ের জন্য অস্বাভাবিক সংযোগস্থলে স্থানীয় চেতনানাশক এবং স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে। যদি ইনজেকশনের পর ব্যথা কমে যায়, তাহলে তা বার্টোলোটি সিন্ড্রোমের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত।


চিকিৎসা:
বার্টোলোটি সিন্ড্রোমের চিকিৎসা সাধারণত ব্যথার তীব্রতা এবং রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে। চিকিৎসার বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে:
* অস্ত্রোপচারবিহীন চিকিৎসা (Conservative Treatment):
* ব্যথানাশক ঔষধ: নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) বা অন্যান্য ব্যথানাশক ঔষধ ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
* ফিজিওথেরাপি: পেশী শক্তিশালী করতে এবং নমনীয়তা বাড়াতে ফিজিওথেরাপি কার্যকর।
* জীবনযাত্রার পরিবর্তন: কিছু নির্দিষ্ট কার্যকলাপ, যেমন – বারবার ঘোরানো বা অতিরিক্ত নমনীয়তা, যা ব্যথা বাড়ায়, সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত।
* তাপ বা বরফ থেরাপি: ব্যথা ও ফোলা কমাতে সাহায্য করে।
* কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন: ব্যথাস্থলে সরাসরি ইনজেকশন দিলে ব্যথা দ্রুত কমে আসে।
* অস্ত্রোপচার (Surgical Treatment):
যদি অস্ত্রোপচারবিহীন চিকিৎসায় ব্যথা না কমে, তবে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। অস্ত্রোপচারের বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে:
* ট্রানজিশনাল সেগমেন্ট রিসেকশন (Transitional Segment Resection): অস্বাভাবিকভাবে সংযুক্ত অংশটি অপসারণ করা হয়।
* স্পাইনাল ফিউশন (Spinal Fusion): কিছু ক্ষেত্রে, মেরুদণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোকে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা হয়।

বার্টোলোটি সিন্ড্রোম একটি জটিল অবস্থা হতে পারে, এবং সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার পিঠের নিচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থাকে, তবে একজন নিউরোসার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Leave a Comment

Scroll to Top