কারপাল টানেল সিনড্রোম (Carpal Tunnel Syndrome - CTS)
কারপাল টানেল সিনড্রোম (Carpal Tunnel Syndrome – CTS) হাতের কব্জির একটি সাধারণ স্নায়ুজনিত সমস্যা। এটি তখন হয় যখন হাতের প্রধান স্নায়ুগুলির মধ্যে একটি, যাকে “মিডিয়ান নার্ভ” (median nerve) বলা হয়, কব্জির মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি সরু পথ বা “কারপাল টানেল”-এর মধ্যে সংকুচিত হয় বা চেপে যায়।
কারপাল টানেল কী?
কারপাল টানেল হলো কব্জির তালুর দিকের একটি সরু সুড়ঙ্গ, যা হাড় এবং লিগামেন্ট (দৃঢ় তন্তুযুক্ত টিস্যু) দ্বারা গঠিত। এই টানেলের মধ্যে দিয়ে মিডিয়ান নার্ভ এবং হাতের আঙ্গুলের পেশীগুলি নিয়ন্ত্রণকারী টেন্ডন (পেশী থেকে হাড়ে সংযুক্ত টিস্যু) চলে গেছে।
মিডিয়ান নার্ভের কাজ:
মিডিয়ান নার্ভ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল (আঙুল), তর্জনী, মধ্যমা আঙুল এবং অনামিকা আঙুলের (রিং ফিঙ্গার) অর্ধেক অংশে সংবেদন প্রদান করে। এটি হাতের কিছু পেশীর নড়াচড়াকেও নিয়ন্ত্রণ করে।
কারপাল টানেল সিনড্রোমের কারণ:
মিডিয়ান নার্ভের উপর চাপ পড়লে কারপাল টানেল সিনড্রোম হয়। এই চাপ বিভিন্ন কারণে সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে:
* বারবার একই ধরনের কাজ করা (Repetitive Stress Injury): দীর্ঘ সময় ধরে বারবার একই ধরনের হাতের নড়াচড়া করা, যেমন:
* কম্পিউটারে টাইপ করা বা মাউস ব্যবহার করা
* মোবাইল ফোন ব্যবহার করা
* বাদ্যযন্ত্র বাজানো (যেমন গিটার)
* হাতে চালানো সরঞ্জাম ব্যবহার করা (যেমন হাতুড়ি, ড্রিল)
* সেলাই বা বুনন করা
* কব্জির আঘাত: কব্জিতে ফ্র্যাকচার, মচকে যাওয়া, বা অন্য কোনো আঘাতের কারণে ফোলাভাব হলে টানেলের মধ্যে চাপ বাড়তে পারে।
* অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা: কিছু রোগ কারপাল টানেল সিনড্রোমের ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন:
* ডায়াবেটিস
* থাইরয়েডের সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম)
* রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং অন্যান্য আর্থ্রাইটিস
* স্থূলতা (ওজন বেশি হওয়া)
* কিডনি ফেইলিউর
* গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় শরীরে তরল ধারণের (fluid retention) কারণে টানেলের মধ্যে চাপ বাড়তে পারে। সাধারণত, গর্ভাবস্থা শেষ হলে এই সমস্যা কমে যায়।
* শারীরিক গঠন: কিছু মানুষের জন্মগতভাবে কারপাল টানেল তুলনামূলকভাবে ছোট হতে পারে।
* লিঙ্গ: পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের এই সিনড্রোম হওয়ার প্রবণতা বেশি।
কারপাল টানেল সিনড্রোমের লক্ষণ:
লক্ষণগুলি সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং সময়ের সাথে সাথে খারাপ হতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
* ব্যথা: কব্জি, হাতের তালু, এবং বৃদ্ধাঙ্গুল, তর্জনী, মধ্যমা আঙুল ও অনামিকা আঙুলের অর্ধেকের মধ্যে ব্যথা। ব্যথা তীক্ষ্ণ বা নিস্তেজ হতে পারে এবং কখনও কখনও বাহু বা কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
* অসাড়তা বা ঝিনঝিন করা: হাত, বিশেষ করে বৃদ্ধাঙ্গুল, তর্জনী, মধ্যমা আঙুল এবং অনামিকা আঙুলের অর্ধেকের মধ্যে পিন-ও-নিডেল (pins and needles) বা ঝিনঝিন করার মতো অনুভূতি।
* দুর্বলতা: আক্রান্ত হাতে দুর্বলতা, বিশেষ করে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরা বা সূক্ষ্ম কাজ করতে অসুবিধা। জিনিসপত্র হাত থেকে পড়ে যাওয়া।
* রাতের বেলা লক্ষণ বৃদ্ধি: রাতের বেলা লক্ষণগুলি প্রায়শই খারাপ হয় এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অনেকে হাত ঝাড়ালে বা নাড়ালে সাময়িক স্বস্তি অনুভব করেন।
* তাপমাত্রা সংবেদনশীলতা: ঠান্ডা বা গরমের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে।
রোগ নির্ণয়:
চিকিৎসক সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা, লক্ষণগুলির ইতিহাস এবং কিছু বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে কারপাল টানেল সিনড্রোম নির্ণয় করেন:
* শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক হাতের পেশীর শক্তি, সংবেদনশীলতা এবং রিফ্লেক্স পরীক্ষা করবেন।
* ফ্যালেন টেস্ট (Phalen’s Test): এই পরীক্ষায় রোগীকে উভয় হাতের তালু এক সাথে করে কব্জি নিচের দিকে বাঁকিয়ে ৬০ সেকেন্ড ধরে রাখতে বলা হয়। যদি মিডিয়ান নার্ভ সংকুচিত হয়, তাহলে ঝিনঝিন বা অসাড়তা বেড়ে যায়।
* টিনেল সাইন (Tinel’s Sign): চিকিৎসক কব্জির উপর দিয়ে আলতো করে টোকা দেবেন, যেখানে মিডিয়ান নার্ভ চলে গেছে। যদি এতে ঝিনঝিন বা বৈদ্যুতিক শকের মতো অনুভূতি হয়, তবে এটি পজিটিভ টিনেল সাইন।
* নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি (Nerve Conduction Study – NCS) এবং ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাম (Electromyography – EMG): এই পরীক্ষাগুলি স্নায়ু এবং পেশীর বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করে নার্ভের ক্ষতি এবং এর তীব্রতা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।
চিকিৎসা:
কারপাল টানেল সিনড্রোমের চিকিৎসা তার তীব্রতা এবং কারণের উপর নির্ভর করে।
Non-সার্জিক্যাল চিকিৎসা (প্রথম সারির চিকিৎসা):
* স্প্লিন্ট বা ব্রেস: রাতের বেলা বা দিনের বেলায় কব্জিতে একটি স্প্লিন্ট ব্যবহার করা হয়। এটি কব্জিকে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে রেখে মিডিয়ান নার্ভের উপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।
* আরাম: যে কাজগুলি লক্ষণগুলিকে বাড়িয়ে তোলে, সেগুলি থেকে বিশ্রাম নেওয়া বা সেগুলি করার ধরন পরিবর্তন করা।
* ব্যায়াম: কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়াম, যেমন নার্ভ গ্লাইডিং এবং স্ট্রেচিং, যা মিডিয়ান নার্ভের নড়াচড়া উন্নত করে এবং চাপ কমাতে সাহায্য করে। এই কনটেন্টে কারপাল টানেল সিনড্রোম (Carpal Tunnel Syndrome – CTS) ব্যায়াম এর ভিডিও আপলোড করা আছে
* ওষুধ:
* নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs): আইবুপ্রোফেন বা নেপ্রোক্সেন-এর মতো ওষুধ ব্যথা এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
* কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন: সরাসরি কারপাল টানেলে কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন দিলে প্রদাহ কমে এবং উপসর্গ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া যায়। তবে, এর প্রভাব সাময়িক হতে পারে।
* জীবনযাত্রার পরিবর্তন: কাজের জায়গায় ergonomic পরিবর্তন আনা, যেমন সঠিক উচ্চতায় কম্পিউটার বা কীবোর্ড ব্যবহার করা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া।
সার্জিক্যাল চিকিৎসা (যখন Non-সার্জিক্যাল পদ্ধতি কাজ করে না):
যদি Non-সার্জিক্যাল চিকিৎসা কাজ না করে বা যদি নার্ভের ক্ষতি গুরুতর হয়, তাহলে সার্জারি একটি বিকল্প হতে পারে। সার্জারির উদ্দেশ্য হলো কারপাল টানেলের লিগামেন্ট (ট্রান্সভার্স কারপাল লিগামেন্ট) কেটে মিডিয়ান নার্ভের উপর থেকে চাপ কমানো। দুই ধরনের সার্জারি প্রচলিত:
* ওপেন কারপাল টানেল রিলিজ: এক্ষেত্রে কব্জির তালুতে চামড়া কেটে পরবর্তীতে কলিগামেন্ট কেটে দেওয়া হয়।
* এন্ডোস্কোপিক কারপাল টানেল রিলিজ: এটি একটি minimally invasive lপদ্ধতি, যেখানে ছোট ছোট চিরা দিয়ে একটি ছোট ক্যামেরা (এন্ডোস্কোপ) প্রবেশ করিয়ে লিগামেন্ট কাটা হয়।
প্রতিরোধ:
কিছু জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং অভ্যাস কারপাল টানেল সিনড্রোম প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে:
* সঠিক ভঙ্গিতে কাজ করা।
* ঘন ঘন বিরতি নেওয়া এবং হাত ও কব্জিকে স্ট্রেচ করা।
* কম্পিউটার মাউস এবং কীবোর্ড এমনভাবে ব্যবহার করা যাতে কব্জি সোজা থাকে।
* ঠান্ডা আবহাওয়ায় হাত গরম রাখা।
* স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
* অন্তর্নিহিত রোগ (যেমন ডায়াবেটিস) নিয়ন্ত্রণ করা।
যদি কারপাল টানেল সিনড্রোমের কোনো লক্ষণ অনুভব করেন, তবে দ্রুত একজন Neurosurgeon এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করলে জটিলতা কমানো যায় এবং স্থায়ী স্নায়ুর ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।